Search
Close this search box.
Search
Close this search box.

নদীতে ডুবে একমাত্র মেয়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না রোজিনা

নদীতে ডুবে একমাত্র মেয়ের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না রোজিনা আকতার। মেয়ের কোনো স্মৃতি মানসপটে ভেসে উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। গড়াগড়ি দিয়ে জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি। জ্ঞান ফিরতেই মেয়েকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। পুরো কক্সবাজার জেলায় ডুবুরি না থাকা নিয়ে প্রশ্নও তুললেন রোজিনা।

আজ শনিবার বেলা দুইটার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার মৌলভীরচর এলাকায় গৃহবধূ রোজিনা আকতারের বাড়িতে গেলে এ দৃশ্য চোখে পড়ে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে বাড়ির পাশের মাতামুহুরী নদীতে ডুবে রোজিনা আকতারের মেয়ে শিখা আকতার (পিংকি মনি) মারা যায়। সে চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এসময় তার দুই খালাতো বোন আসমাউল হোসনা ও তাসপিয়া জান্নাতকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। আসমাউল একই প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির ও তাসপিয়া ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

জানা যায়, গতকাল শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিখা আকতার, আসমাউল হোসনা ও তাসপিয়া জান্নাত মাতামুহুরী নদীতে গোসলে যায়। এসময় আসমাউল নদীর হাঁটু পানিতে ছিল। আর শিখা আকতার ও তাসপিয়া গলা সমান পানিতে ছিল।

আসমাউল হোসনা গতকালকের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলে, হঠাৎ স্রোতে শিখা ও তাসপিয়া ডুবে যেতে থাকে। এসময় হাত নেড়ে শিখা বাঁচার আকুতি জানালে আমি নদীতে নেমে তাকে কাঁধে তুলে নিই। কাঁধে তুলে নিতেই তার ভর সইতে না পেরে দুজনেই ডুবে যেতে থাকি। একপর্যায়ে পাশে গোসলরত এক নারী একটি লাঠি দিলে সেটি ধরে আমি কূলে আসি। ওই সময় নদীর অপরপ্রান্ত থেকে নুরুল আজিম নামের এক বাসিন্দা সাঁতরে এসে তাসপিয়াকে উদ্ধার করে। ততক্ষণে শিখা কয়েকবার হাত দেখিয়ে ডুবে যায়।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া পৌরসভার মাতামুহুরী সেতুর পাশ ঘেঁষে বাঁ দিকে একটু গেলে টিনের ঘেরা ও ছাউনি দিয়ে নদীতে ডুবে মারা যাওয়া শিখা আকতারের বাড়ি। শিখার বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া বাড়িতে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে জীবিত উদ্ধার হওয়া আসমাউল হোসনা ও তাসপিয়া জান্নাত।

বাড়িতে ঢুকতেই কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল শিখার মা রোজিনা আকতারের। শিখার নানা স্মৃতি মনে করে কান্না করছিলেন তিনি। সাংবাদিক পরিচয় পেতেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন পুরো কক্সবাজারেই কোনো ডুবুরি নেই কেন? আপনারা সরকারকে বলতে পারেন না, চকরিয়ায় ডুবুরি দিতে। কাল যদি তাৎক্ষণিক ডুবুরি পেতাম আমার মেয়েকে জীবিত ফিরে পেতাম। চারঘন্টা পর কেন চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি আনতে হবে? সরকার আমাদের সঙ্গে এমন বৈষম্য কেন করছে? চট্টগ্রামে থাকবে, কক্সবাজারে থাকবে না কেন? আমরা কি দোষ করেছি? একনাগাড়ে কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন রোজিনা আকতার।

শিখা আকতারের প্রসঙ্গ উঠতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন তিনি। রোজিনা বলেন, ‘আমার একটি মাত্র সন্তান। এই সন্তানের মুখ চেয়ে জীবন কাটাচ্ছিলাম। সেও আমাকে একা করে দিয়ে চলে গেছে। আমি কি নিয়ে বাঁচব।’

এরপর নিজে নিজে উঠে শিখার পড়ার টেবিলে যান রোজিনা। একটি বই হাতে নিয়ে বিলাপ করতে থাকেন তিনি। বলেন, ‘অ পুত বই এগুন আঁই পড়িবার লাই রাখি গিয়স দে নে। আঁই এই বই কেনে পইজ্জম। তোরে আঁই হদুন বই কিনি দিইয়ি। আরও দিতাম দে এরি অ পুত। তুই কা আঁরে ফেলাই গিয়সগই।’

কান্নার একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন রোজিনা। পানি ও লেবুর সুগন্ধি নাকে দিলে ১০-১২ মিনিট পর জ্ঞান ফেরে তাঁর। আবারও বলতে থাকেন, ‘আমার মেয়ে হলেও শিখা, ছেলে হলেও শিখা। ছেলে-মেয়ের সব আদর ওকেই দিতাম। এখন ও আমাকে একা করে দিল। আল্লাহ আমার ওপর এ কেমন প্রতিশোধ নিল! ও খোদা, আমি এমন কি অপরাধ করেছিলাম তোমার। আমার কলিজাটা ছিঁড়ে নিলে তুমি।’

আসমাউল হোসনা ও তাসপিয়া জান্নাতের বাবা নুরুল আবছার বলেন, মেয়েরা মাঝেমধ্যে নদীতে গোসল করতে যায়। আমরা জানতে পারলে বকা দিই। ওরা সাঁতার জানে না। গতকালও আমাদের অগোচরে গোসলে গেছে। আরেকটু এদিক ওদিক হলেই আমার দুই মেয়েকে হারাতাম। অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধ করতে প্রশাসনকে অনুরোধ করেন তিনি।

স্থানীয় লোকজন বলেন, মাতামুহুরী নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলায় কিছু গুপ্ত গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। শিখা যেখানে ডুবে মরেছে একইস্থানে ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই ফুটবল খেলতে গিয়ে পাঁচ স্কুল ছাত্রের মৃত্যু হয়েছিল। এতো মৃত্যুর পরও মাতামুহুরী নদী থেকে বালু উত্তোলন থেমে নেই।

ডুবুরির অপ্রতুলতার কথা জানিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, চকরিয়ার স্টেশন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দিদারুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশে ডুবুরি খুব কমই আছে। বিভাগীয় পর্যায়ে তাঁদের অবস্থান থাকে। প্রতিটি উপজেলায় না হলেও জেলা পর্যায়ে একটি ডুবুরি টিম থাকা দরকার।’

দিদারুল হক বলেন, ‘অনেক সময় নদীতে গভীরতা বেশি থাকলে এবং স্রোত বেশি হলে আমরা কাজ করতে পারি না। এরকম ইকুপমেন্টও আমাদের নেই। একারণে স্থানীয় লোকজন আমাদের ওপর ক্ষেপে যায়। তখন খুব বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।’

0Shares