
রকমারি সবজি ও ধান চাষের জন্য উর্বরভূমি খ্যাত কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় আগেকার সময়ে তরমুজ চাষ ছিল বেশ পরিচিত একটি দৃশ্য। কিন্তু আবহাওয়ার বৈরী আচরণ এবং ভেজাল বীজের চারা রোপনে অনিশ্চিত ফলনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই জনপদে তরমুজ চাষ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এমন প্রেক্ষাপটে তরমুজ চাষে আগ্রহ ও ভরসা হারিয়ে ফেলেন স্থানীয় কৃষকেরা।
তবে আগ্রহ হারানো চকরিয়া উপজেলার কৃষককুলে
তরমুজ চাষে সম্ভাবনার নতুন ধার উন্মোচন করেছে
সরকারি নিবন্ধনভুক্ত বীজ বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের শহীদ এগ্রো সীড্ ফার্ম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বীজ গবেষণা ইনস্টিটিউট কতৃক উন্নতমানের বীজের তকমা পাওয়া হাইব্রিড জাতের তরমুজ ‘এশিয়া প্লাস’ এখন প্রতিকূল আবহাওয়াকে ডিঙিয়ে এখন চকরিয়া উপজেলার উর্বর মাটিতে আশাজাগানিয়া ফলন দেখা দিয়েছে। চারা রোপনের পর ৬৫ দিনের মধ্যে ক্ষেত থেকে একেকটি তরমুজ ৬ থেকে ৮ কেজি ওজনের হবে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের কামালউদ্দিন মাস্টারঘাটা এলাকায় মাতামুহুরী নদী লাগোয়া উর্বর জমিতে চলতি মৌসুমে এশিয়াপ্লাস জাতের তরমুজ চাষ করেছেন কৃষক নুরুল কবির। তিনি বলেন, ৬ কানি জমিতে নভেম্বর মাসের শুরুতে চারা রোপণ করা হয়েছে। জমি লাগিয়ত, সেচ খরচ ও শ্রমিক মুজুরি মিলিয়ে আমার এক লাখ টাকার মতো খরচ হবে। এখন ক্ষেত পরিচর্যায় পুরো সময় দিচ্ছি। এশিয়াপ্লাস জাতের তরমুজ ৬৫ দিনের মধ্যে ফলন শুরু হবে প্রতিটি গাছে। মৌসুম শেষে ৬ কানি জমিতে আমি ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবো বলে আশাবাদী।
কৃষক নুরুল কবিরের মতো পাশের পাহাড়ি জনপদ লামার ইয়াংছা এলাকায় এশিয়াপ্লাস জাতের তরমুজ চাষ করেছেন চাষী আবদুস সালাম মেম্বার। তিনি বলেন, অক্টোবর মাসে দুই কানি পাহাড়ি জমিতে তরমুজের চারা রোপণ করা হয়েছে। তিনমাসের মধ্যে এখন প্রতিটি গাছে ভালো ফলন এসেছে।
মেসার্স শহীদ এগ্রোসীড ফার্মের চকরিয়া উপজেলা ব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বলেন, চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা হাইব্রিড জাতের এশিয়াপ্লাস তরমুজ চাষ করে ভালো ফলন পেতে শুরু করেছে। চাষের ভালো অবস্থা দেখাদেখিতে এখন বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা তরমুজ চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তিনি বলেন, চকরিয়া উপজেলার পাশাপাশি চলতি মৌসুমে লামার ইয়াংছা ও নাইক্ষংছড়ি সীমান্তের কুতুপালং এলাকায়ও ব্যাপক জমিতে এশিয়াপ্লাস জাতের তরমুজ চাষ করেছেন কৃষকেরা।
কুতুপালং এলাকার চাষি মাহাবুব আলম বলেন, তিনমাস আগে অক্টোবর মাসের শুরুতে তিন কানি জমিতে ১৭৫০টি এশিয়াপ্লাস জাতের তরমুজ চারা রোপণ করেছি। তাঁর মধ্যে ১৭ শত চারা বেড়ে উঠেছে। চাষের শুরু থেকে এই পর্যন্ত আমার ৮০ হাজার টাকা খরচ পড়েছে। এখন প্রতিটি গাছে তিনটি আবার কোন গাছে চারটি ফলন এসেছে। চলতি মাসের শেষদিকে বিক্রি শুরু করবো। সেই পর্যন্ত তিন কানি জমিতে আমার খরচ পড়বে এক লাখ ২০ হাজার টাকার মতো। ক্ষেতের তরমুজ বিক্রি করে সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি আয় করতে পারবো বলে আমি আশারাখি।
চকরিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি অফিসার (হিসাব ও উন্নয়ন) মোঃ আরিফুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে চকরিয়া উপজেলার কয়েকটি এলাকায় প্রায় ১৯ একর (সাড়ে সাত হেক্টর) জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত তরমুজ ক্ষেত তদারকি করছেন। চাষে কোনধরনের অসঙ্গতি তৈরি হলে সঙ্গে সঙ্গে তা নিবারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
চকরিয়ার উর্বর মাটিতে সাড়াজাগানো তরমুজ চাষে বীজ বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স শহীদ এগ্রোসীড ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, এশিয়াপ্লাস একটি উন্নত জাতের তরমুজ। এই জাতের বীজ রোগ সহনশীল এবং যেকোনো আবহাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ্য। মাটির সঙ্গে সংমিশ্রণ হয়ে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার কারণে এশিয়া প্লাস তরমুজ চাষে আশানুরূপ ফলন এসেছে। এ জাতের তরমুজ ৬৫ দিনে ফলন আসে। আকারে বড়, স্বাদে মিষ্টি ও বাজারজাতকরণে অধিক লাভজনক। এতে কৃষকেরা ভালো লাভবান হন।
শহীদুল ইসলাম বলেন, আমরা আগে কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও যেকোনো চাষে ভালো ফলন লাভের বিষয়টি অনুধাবন করি। সেই দায়বদ্ধতা থেকে বাজারে ভালোমানের বীজ সরবরাহ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। দীর্ঘ দুইযুগের বেশি সময় ধরে শহীদ এগ্রোসীড দেশব্যাপী পান্তিক কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করছেন। ব্যবসার বিপরীতে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ঐতিহ্য ধরে রাখায় হচ্ছে মুল চাবিকাঠি।
এশিয়াপ্লাস জাতের তরমুজ চাষের এই সাফল্য প্রমাণ করে, ভালো বীজ, আধুনিক কৃষির চিন্তা আর পরিশ্রম থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। শহীদ এগ্রো সীড্ এই অনুপ্রেরণাকে পুঁজি করে আজ তরমুজ চাষে চকরিয়ার কৃষিতে নতুন করে আশার আলো ছড়িয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় চলতি মৌসুমে সাড়ে সাত হেক্টর জমিতে কৃষকেরা তরমুজ আবাদ করেছেন। চাষের শুরু থেকে কৃষি বিভাগের পক্ষথেকে তরমুজ চাষিদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত চাষ তদারকি করে কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন। সেকারণে ভালো ফলন এসেছে।
তিনি বলেন, তরমুজ চাষে ভালো ফলনে কৃষকেরা লাভবান হবার দেখাদেখিতে আগামীতে চকরিয়া উপজেলায় চাষের পরিধি আরও বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।





