Search
Close this search box.
Search
Close this search box.

আন্তর্জাতিক নারী দিবসঃ শ্রমিক থেকে লবণচাষি তারা

শুক্রবার দুপুর ১২টা। পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের হাজীরপাড়ার লবণ মাঠে তপ্ত রোদে কাজ করছেন তিন নারী। বুলু আকতার কুয়ো থেকে পানি তুলে ছিটিয়ে দিচ্ছেন মাঠে। ছেমন আরা ও পারভীন মাঠে থাকা লবণ এক জায়গায় জড়ো করছেন। বিকেলের দিকে সেই লবণ তারা কেজি মেপে মাথায় করে নৌকা বা ট্রাকে তুলে দেবেন। তখনই হাতে পাবেন লবণ বেচার টাকা। সেই টাকা দিয়ে ইফতারি কিনবেন, বাজার করবেন।

তিন নারী শুরুতে ছিলেন লবণ মাঠের শ্রমিক। এখন তারা লবণ চাষি। মাঠ লিজ নিয়ে লবণ চাষ করেন তারা। বেশ কয়েকজন পুরুষ শ্রমিকও মজুরির বিনিময়ে কাজ করেন তাদের লবণ মাঠে। ছেমন আরার স্বামী মারা গেছেন। তার কন্যা পারভীন। প্রতিবন্ধী সন্তান হওয়ার পর পারভীনকে ছেড়ে চলে গেছে তার স্বামী। ছেমন আরা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় যা বললেন তার অর্থ এমন- ‘আমরা সারাদিন, সারাজীবন কেবল কাজই করছি। এখন লবণ মাঠে লবণ উৎপাদন করি। সামনে ক্ষেতখামারে কাজ করব। আমরা মাঠে মরিচ বুনতে জানি, জানি ক্ষেতের ধান কাটতে। এই জীবনে বেশি আনন্দ নেই, তবে সুখ আছে।’

পারভীন লবণ তৈরির ‘সহজ’ পদ্ধতি জানালেন-জোয়ারের সময় খাল দিয়ে আসা সমুদ্রের লবণাক্ত পানি লবণ মাঠের পাশে থাকা কুয়োয় জমিয়ে রাখতে হয় প্রথমে। তারপর মাঠে সমান্তরালভাবে বিছিয়ে দিতে হয় পলিথিন, পলিথিনের ওপর ছিটিয়ে দেওয়া হয় লবণাক্ত পানি। সূর্যের তাপে বাস্পীভূত হয়ে তৈরি হয় লবণ। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগে ৫-৬ দিন।

বুলু জানান, এক কানি (২০ গণ্ডা) লবণ মাঠ তৈরিতে কালো পলিথিন লাগে ৯ হাজার টাকার, শ্রমিক খরচ ১০ হাজার টাকা। আনুষঙ্গিক আরও ৫ হাজার টাকাসহ মোট উৎপাদন খরচ হয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এক কানি মাঠে মৌসুমে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ মণ লবণ পাওয়া যায়। সে হিসাবে এক কানি মাঠে ৫০-৬০ হাজার টাকার লবণ উৎপাদন হয়। খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে ১৫-২০ হাজার টাকা।

এখন প্রতিমণ লবণ বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়। মাঠ থেকে গাড়ি বা নৌকায় তুলতে মণপ্রতি খরচ লাগে ৩০ টাকা। খরচ বাদে চাষিরা দাম পান মণপ্রতি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা। আবহাওয়া খারাপ থাকলে উৎপাদন কমে যায়।

পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের হাজীপাড়ায় দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম ছেমন আরার। বাবা-মা দুজনই ছিলেন দিনমজুর। অভাব দেখে বড় হয়েছেন তিনি। কষ্ট করে কোনো রকমে নুনেভাতে চলত সংসার। ছোটবেলায় ভর পেটে খাবার খুব কম দিনই জুটত ছেমন আরার। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড়ের পর ধারদেনা করে বাবা-মা বিয়ে দেন তাঁর। স্বামীও দিনমজুর, কাজ করতেন লবণ মাঠে। সেই পুরোনো ক্ষুধা আর অভাব তাঁর পিছু ছাড়েনি। স্বামীও বাবা-মায়ের মতোই দিনমজুর। কোল আলো করে আসে কন্যা পারভীন আক্তার। তারপরই ঘটল বিপদ, হঠাৎ একদিন মারা গেলেন স্বামী। সংসার চালাতে গিয়ে চোখে অন্ধকার দেখলেন। অবশেষে কন্যাকে পিঠে বেঁধে নেমে গেলেন স্বামীর পেশায়, লবণ মাঠে দিনমজুরি শুরু করলেন।

ছেমন আরা বলেন, ‘অভাবের সংসার আলোকিত করেছিল আমার মেয়ে পারভীন। খেয়ে না খেয়ে জীবন ধারণ করলেও ছোট্ট পারভীনের মায়ায় সব ভুলে থাকতাম। কিন্তু সন্তান জন্মের বছর তিনেক পর আমার জীবনে নেমে আসে বড় এক বিপর্যয়। লবণ মাঠের কাজ থেকে ফেরার পর এক সন্ধ্যায় হঠাৎ কোনো পূর্ব লক্ষণ ছাড়াই মৃত্যু হয় স্বামীর। আমার বয়স তখন খুব কম, কোথায় যাব, কীভাবে সংসার চালাব এ নিয়ে পাগল হওয়ার দশা। এইসময় কী করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এমন এক দুঃসময়ে প্রায় তিন দশক আগে উপায় না দেখে লবণ মাঠে শ্রমিক হিসাবে কাজে যোগ দিই। কয়েকদিন মেয়ের মুখে ভাত তুলে দিলেও আস্তে আস্তে তাও বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় শশুর বাড়ির লোকেদের নির্যাতন। ঠাঁই হয়না আর স্বামীর বাড়িতে। চলে যান বাপের ভিটায়। শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। দিনমজুরী শুরু করেন লবণের মাঠে, ধানের মাঠে, মানুষের ঘরে। কিন্তু সবসময় কাজ থাকেনা হাতে, তখন বের হন ভিক্ষার থলে হাতে নিয়ে। এ পাড়া ও পাড়া থেকে চেয়ে নিয়ে আসেন চাল, কেউ আবার মায়া করে দুটি ভাংতি পয়সাও দেয়। আবার কেউ কেউ দরজা থেকেই বিদায় করেন। কিন্তু এদিকে বড় হতে থাকেন মেয়ে পারভীন। এভাবে একদিন ভিক্ষা করেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন এক দিনমজুর ছেলের সাথে। পারভীনের ঘরেও কোল আলো করে আসে এক ছেলে সন্তান। ভাগ্য এবারও পরিহাস করে তাঁদের সাথে, বাচ্চাটি প্রতিবন্ধী। এরই জেরে কিছুদিন পর পারভীনকে পরিত্যাগ করে তার স্বামী। তারও স্থান সেই মায়ের ঘরেই। ছেমন আরার ভিক্ষার থলেতে এসে জুটে মেয়ে আর প্রতিবন্ধী নাতির দায়িত্বভার।

ছেমন আরার বাপের ভিটায় থাকা একমাত্র ভাই আবু কালাম; যিনি শহরে এক বাসায় দারোয়ান ছিলেন। হাঁপানি রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনিও বাড়িতে চলে আসে। আবুল কালামের দুই ছেলে বিয়ের পর আলাদা হয়ে কেউ ভাত দেয়না বাবা-মাকে। অগ্যতা আবুল কালামের বৃদ্ধা স্ত্রী বুলু আক্তারকেই নিতে হয়েছে তাঁর ভাতকাপড় চিকিৎসার ভার। বৃদ্ধ বয়সেই করছেন মাঠে-ঘাটে দিনমজুরীর কাজ। এরই মাঝে ছেমন আরা, পারভীন আক্তার ও বুলু আক্তার মিলে শুরু করে লবণের চাষ। জমিদারের থেকে দাদন নিয়ে শুরু করে লবণের চাষ। শর্তমতে যা ফসল হবে তার অর্ধেক পাবে জমিদার আর অর্ধেক পাবে চাষী। কিন্তু এবারো ভাগ্য তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালো, লবণের দাম কম হওয়ায় আশংকা করছেন ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার। আড়াই কানি দাদন নেওয়া জমিতে দিনরাত খাটছেন তাঁরা তিনজন।

রাজাখালী ইউনিয়ন লবণ মৎস্য ও কৃষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল হালিম বলেন, মহিলাগুলো জন্ম থেকেই অসহায়। ভাগ্য বদলাতে তারা লবণ চাষ শুরু করেছে। আমি আমার সমিতির পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব সার্বিক সহযোগিতা করব। সরকার যদি লবণের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করে তবে তাদের মুখে অবশ্যই হাসি ফুটবে।

পেকুয়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, সমাজসেবা অফিস সবসময় দেশের প্রান্তিক অসহায় নারী ও মানুষদের পাশে আছে। আমরা তাদের অসহায়ত্বের ব্যাপারে জেনেছি। অতিশীঘ্রই তাদের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করব।

0Shares